ইউরোলজিস্ট ও যৌনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশিকা
মূল পরামর্শ: ধূমপান ত্যাগ, প্রতিদিন ৩০ মিনিট পেলভিক এক্সারসাইজ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটা অভ্যাস একসাথে মেনে চললে দ্রুত বীর্যপাত (Premature Ejaculation) ও উত্থানজনিত সমস্যা (Erectile Dysfunction)-এর ঝুঁকি ৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে পুরুষদের মধ্যে দ্রুত বীর্যপাত এবং পুরুষাঙ্গের উত্থানজনিত সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়মিত জীবনযাত্রা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং খাদ্যাভ্যাস।
সুখবর হলো, সংকোচ কাটিয়ে ছোট ছোট কিছু অভ্যাস গড়ে তুললেই এবং সঠিক জীবনযাত্রা মেনে চললেই এই যৌন সমস্যাগুলো দূর করে পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা ফিরে পাওয়া সম্ভব। নিচে চিকিৎসকদের পরামর্শে সাজানো হলো এমন কিছু অভ্যাস, যা ধাপে ধাপে জীবনে যোগ করা যায়।
১. কেগেল ও পেলভিক ব্যায়াম (পেশির শক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়)
পেলভিক ফ্লোর মাসল বা তলপেটের নিচের পেশি দুর্বল হয়ে পড়লে বীর্যপাত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। কেগেল এক্সারসাইজ (Kegel Exercise) সরাসরি এই পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে বীর্যপাত বিলম্বিত করতে এবং উত্থানপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
যা করতে পারেন:
প্রস্রাব আটকানোর সময় যে পেশি ব্যবহার করা হয়, সেটিকে সংকুচিত করে ৫ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং তারপর ছেড়ে দিন। প্রতিদিন ১০-১৫ বার করে দিনে ৩ সেটে এই ব্যায়াম করুন।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, স্কোয়াট (Squat) বা অ্যারোবিক ব্যায়াম করুন, যা যৌনাঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়।
দীর্ঘসময় এক জায়গায় বসে কাজ করার অভ্যাস ত্যাগ করুন।
২. খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন (রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে মেপে খাওয়া)
যৌন সক্ষমতার জন্য রক্তনালীর স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার ও প্রক্রিয়াজাত খাবার রক্তনালীতে চর্বি জমায়, যা রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে উত্থানজনিত সমস্যা (ED) সৃষ্টি করে।
যা করতে পারেন:
খাদ্যতালিকায় নাইট্রেট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন (যেমন: তরমুজ, ডালিম, রসুন, পালং শাক ও বাদাম)।
অতিরিক্ত তেলের খাবার, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।
রক্তে শর্করার মাত্রা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ যৌন সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ।
৩. স্ট্রেস ও উদ্বেগ কমান (শারীরিক সমস্যার চেয়ে মানসিক কারণ বড়)
দ্রুত বীর্যপাত ও উত্থানজনিত সমস্যার প্রায় ৬০-৭০% শারীরিক নয়, বরং ‘পারফর্মেন্স অ্যাংজাইটি’ বা পারফর্ম করার অতিরিক্ত ভয় ও মানসিক চাপের কারণে ঘটে। মানসিক চাপ শরীরে করটিসল ও অ্যাড্রেনালিন বাড়ায়, যা যৌন আকাঙ্ক্ষা ও সক্ষমতা কমায়।
যা করতে পারেন:
প্রতিরাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন।
সহবাসের সময় ফলাফল বা পারফর্মেন্স নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে পারস্পরিক মানসিক সখ্যতার দিকে মনোযোগ দিন।
পর্নোগ্রাফি আসক্তি এবং অতিরিক্ত হস্তমৈথুনের অভ্যাস ত্যাগ করুন; এগুলো মস্তিষ্কের যৌন প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাড়তি কিছু অভ্যাস যা সাহায্য করে:
ধূমপান ও মদপান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করুন: নিকোটিন যৌনাঙ্গের সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে তোলে, যা সরাসরি উত্থানজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে।
নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করুন: বিশেষত ৩০ বছরের পর ব্লাড সুগার, হরমোন (টেস্টোস্টেরন লেভেল) এবং কোলেস্টেরল বছরে অন্তত একবার চেক করুন।
সঙ্গীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন: লজ্জা বা সংকোচ না রেখে সঙ্গীর সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ান, এতে মানসিক চাপ অনেক কমে যায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরেও ৩ মাসের বেশি সময় ধরে ক্রমাগত দ্রুত বীর্যপাত ঘটে, যৌন মিলনে বারবার ব্যর্থতা দেখা দেয়, বা যৌন আকাঙ্ক্ষা একেবারেই কমে যায়, তবে কবিরাজি বা অপচিকিৎসার আশ্রয় না নিয়ে অবিলম্বে একজন সার্টিফাইড ইউরোলজিস্ট বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট/সেক্সোলজিস্ট-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক নির্দেশিকা। যেকোনো প্রদেয় পরামর্শ বা চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্যের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।


